বৈশাখী স্মৃতিচারণ

0
44

তৌহিদুল ইসলাম রবিনঃ

সেই দিনগুলি আর পাবো না ফিরে
এখন সবার বৈশাখ পান্তা-ইলিশ, ফেসবুক, সেলফি আর ডিজে পার্টিকে ঘিরে!

আমাদের সংস্কৃতির মাঝে আনন্দ ছিলো, সুখ-দুঃখের মিশেলে ছিলো বৈশাখী উৎসব। ছিলো আন্তরিকতা, ছিলো সৌহার্দ।
ধর্মের মতোবিরোধ এবং কুসংস্কার বলে কোনো বাধাই ছিলো না। সেই ছোটবেলার ঈদের মতো সেরা একটা দিন পহেলা বৈশাখের আনন্দকে হার মানাতে পারেনি।

ঈদ আসছে আসছে করে যেমন একটা আনন্দ ছিলো পহেলা বৈশাখও সে আনন্দের কমতি থাকতো না।

পহেলা বৈশাখের আগের রাতেই সব বন্ধুদের প্ল্যান হয়ে যেতো। কে কিভাবে দিন শুরু করবে।
মাটির ব্যাংকে জমানো স্কুল খরচের বাঁচানো টাকার সাথে কার থেকে কত বকশিস নেয়া যায় সে চেষ্টায় থাকতাম।

গ্রামে কথিত ছিলো, সে দিনটি যেভাবে শুরু হবে সারা বছর সবার তেমনই যাবে।ফজরের আজানের সাথে সাথেই ঘুম থেকে উঠে যেতাম। বন্ধুরা মিলে একসাথে নদীতে গোসল করতে যাওয়ার সময় সঙ্গে রাখতাম সারা বছর সুস্থ থাকার ওষুধ হিসেবে গ্রামে প্রচলিত ‘ভাদি গাছের’ গোটা।পহেলা বৈশাখে সর্বপ্রথম খাদ্যটা হলো খালি পেটে পানির নিচে ডুব দিয়ে এই ভাদি গাছের গোটা গিলে খাওয়া।

এরপর ফজরের নামাজ পড়া থেকে আমাদের দিন শুরু। হিন্দুদেরও আহা কি আনন্দ!এক ধরনের প্রতিযোগিতার মতো দু’গ্রামে। পাশের হিন্দুপাড়ার সবাই একসঙ্গে স্লোগান দিতো, এই গ্রামের বালা সে গ্রামে যা, এই বাড়ির বালা সে বাড়িতে যা (বালা মানে বোঝানো হতো, এলাকার সকল দুর্যোগ বা রোগবালাই এবং খারাপ দিকগুলো)।

সেদিন সবাই বলতো, আজ আমের বিয়ে। এই আমের বিয়ের অপেক্ষায় অনেকেই কাঁচা আম খেতো না।নানি-দাদি বয়স্ক মুরুব্বিরা বলতেন বছরের প্রথমদিন ভালো খেলে সারাবছরই নাকি ভালো খাওয়া যায়। তাই সেদিন মনে মনে ভালো খাওয়াই আশা করতাম। কিন্তু মা-খালারা সেদিন সব ধরনের সবজি মিশিয়ে একসাথে রান্না করতো। যেটাকে গ্রাম্য ভাষায় পাঁচন বলা হতো।

সকালে নাস্তাতে চিড়া, মুড়ি, মিঠাই, বিন্নি ধানের খইয়ের সাথে বিভিন্ন হাতে বানানো পিঠা।প্রথমদিন যেভাবে কাটবে সারা বছর সেভাবে যেনো কাটে। তাই আম্মু বলতেন আজ কারো সাথে কোনো মিথ্যে কথা বলবে না, ঝগড়া করবে না।
আর আমরাও কথাগুলো বিশ্বাস করে লক্ষ্মী ছেলের মতো দিনটি পার করে দিতাম।

আমাদের কাছে বৈশাখের প্রধান উৎসবই ছিলো মেলা। নাগরদোলাতে না চড়লে বৈশাখের তৃষ্ণা যেনো আর মিটে না। মেলায় কেনাকাটাতো করতেই হবে।হাতপাখা, লোভনীয় জিলাপি, হাতি ঘোড়ার মিঠাই, আবার এক বছরের টাকা জমানোর জন্য মাটির ব্যাংক, ঢোল, বাঁশি, আম খাওয়ার জন্য নতুন ছুরি অবশ্যই কিনতে হবে।ছোট বোনের জন্য রঙিন সুতা, হাতের কাঁকন, নাকের নোলক, মাটির কলস, কাঠের পুতুল, চুড়ি, ফিতা এইগুলো কিনে না নিলে আর কান্না থামানো যাবে না। মাথার চুল সব টেনে ছিঁড়ে ফেলবে।

বহুদূর ফেলে এসেছি সেই পহেলা বৈশাখের দিনগুলো।সেই দিনগুলি আর পাবো না ফিরে। দিনবদলের সাথে সাথে আধুনিক সভ্যতার হাত ধরে অনেক পরিবর্তন এসেছে বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ উদযাপনে। এখনকার সময় সকালবেলা পান্তা-ইলিশ দিয়ে দিন শুরু না করলে পহেলা বৈশাখ যেনো উৎযাপনই হয় না।এখন ব্যবসায়ীদের কাছে হালখাতা মানেই ডিজে পার্টির আয়োজন করে পান্তা-ইলিশ খাওয়ানোর নামে রমরমা ব্যবসা করা।

বর্তমান যুগের ছেলেমেয়েদের ফেসবুকেই যেনো সব আনন্দ উৎসব সীমাবদ্ধ! নতুন সাজে সেজে সেলফি তোলাতেই হারিয়ে ফেলেছে সে বাঁশের বাঁশির আওয়াজ, নাগরদোলায় চড়ার মতো আনন্দ।যুগের সাথে তাল মিলিয়ে হয়তো ভবিষ্যতে বৈশাখী উৎসবের আরো অনেক পরিবর্তন হবে।

উৎসব যেমনই হউক, ছোট ছোট রাগ, অভিমান, বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা যেনো উৎসবের উদারতার কাছে সবসময়ই নগন্য হয়ে থাকে সেটাই কাম্য। শুভ নববর্ষ।

তৌহিদুল ইসলাম রবিন
লাকসাম, কুমিল্লা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here