২৫ বছরের শিক্ষকতা শেষে অবসরে জাফর ইকবাল

0
7

অনলাইন ডেস্কঃ
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষ করেছেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল।

বুধবার (৩ অক্টোবর) ছিল তার চাকরির শেষ দিন। এদিন তার বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হয়েছে।

চাকরি জীবনের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটলেও তিনি বিভাগে ক্লাস নেবেন এবং বর্তমানের বাসাতেই থাকবেন বলে জানান।

অবসর গ্রহণের দিনটিকে স্মরণীয় করতে বুধবার সন্ধ্যায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আনন্দ আড্ডায় মিলিত হন জনপ্রিয় এই লেখক।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেছিলেন ড. জাফর ইকবাল। পরবর্তীতে ‘ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্স’ বিভাগকে ‘কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ’ ও ‘ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ দুটি বিভাগ আলাদা করে দুই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে পড়াতে থাকেন তিনি।

শিক্ষক হিসেবে শেষ দিনের আড্ডায় সহকর্মীদের সহযোগিতা, শিক্ষার্থী এবং দেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসার কথা বলেন জাফর ইকবাল। পাশাপাশি তুলে ধরলেন সিলেটে থাকাকালীন জীবেনর এই অধ্যায়ে তার উপর নেমে আসা বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা।

তিনি বলেন, “পৃথিবীতে আমার মতো সুখী মানুষ আর নাই। আমি মানুষের কাছ থেকে যত ভালবাসা পেয়েছি, আমার মনে হয় না অন্য কেউ আমার মতো এতো পেয়েছে; কিন্তু তাদের আমি কিছুই দিতে পারি নাই।”

এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অনেক ভালো সময় কেটেছে, অনেক সুন্দর সময় কেটেছে বলে উল্লেখ করেন শিক্ষার্থীদের প্রিয় এই শিক্ষক।

“আমেরিকায় গেলে মানুষ আর দেশে ফিরতে চায় না; কিন্তু ইয়াসমিনকে (স্ত্রী) নিয়ে যখন এখানে আসলাম, তখন এমনভাবে জড়িয়ে পড়লাম আর যেতে পারলাম না,” বলেন তিনি।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সামনের দিনগুলো শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবেন বলে প্রতিশ্রতি দেন জাফর ইকবাল।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন জাফর ইকবাল। ১৯৮২ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে ক্যালিফোর্নিয়া ইনিস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে গবেষণা শুরু করেন।

১৯৮৮-১৯৯৪ পর্যন্ত তিনি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান বেল কমিউনিকেশনস রিসার্চ (বেলকোর)-এ গবেষণা করেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন তিনি।

একাডেমির বাইরে একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছিলেন এই জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অর্জনের সঙ্গে জাড়িয়ে আছে এ অধ্যাপকের নাম। মোবাইল ফোনে ভর্তি প্রক্রিয়া, পিপীলিকা সার্চ ইঞ্জিন, ‘ড্রোন ও রোবট’, ওয়াইফাই ভিত্তিক ক্যাম্পাস, সেমিস্টার পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর মতো নানা যুগান্তকারী অর্জন সম্ভব হয়েছে জাফর ইকবালের হাত ধরে।

নিজের নানা অর্জনের বিষয়ে জাফর ইকবাল বলেন, “আমি একা এসব কাজ করিনি। আমার সহকর্মীরা এসব কাজে বেশি শ্রম দিয়েছেন। তাদের শ্রমের ফলেই এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে।”

‘ইসলাম বিরোধী’ অভিযোগ তুলে চলতি বছরের ৩ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে এক রোবট প্রতিযোগিতা চলাকাকালে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরি নিয়ে হামলা চালায় এক তরুণ।

আড্ডায় সেই ন্যাক্কারজনক হামলার ব্যাপারে কথা বলেন জাফর ইকবাল।

তিনি বলেন, “একটি গ্রুপ অন্ধভাবে মানুষকে বুঝিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করছে। আমি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষ। তাই স্বাধীনতা বিরোধীরা নাস্তিক বলে আমাকে হত্যা করতে চায়, যাতে সাপোর্ট মিলে।”

১৯৯৮ সালের দিকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার বাসায় মৌলবাদী সংগঠনের পরপর দুইবার হামলার ঘটনায় জীবনে নেমে আসা নিরাপত্তাহীনতার কথাও স্মরণ করলেন জাফর ইকবাল।

তিনি বলেন, “আমারা (তিনি এবং স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন) রিস্ক নিয়ে এখানে শিক্ষকতা করেছি। তবে আমাদের সন্তানকে ঢাকায় বাসা ভাড়া করে রেখেছিলাম নিরাপত্তার জন্য। তাদের সাথে দেখা করতে শুধু উইক এন্ডে ঢাকায় যেতাম।”

আনন্দ আড্ডা আয়োজনের শুরুতে জাফর ইকবালকে উৎসর্গ করে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পরে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন বিভাগের তার সহকর্মীরা। তারা প্রিয় শিক্ষককের অবসরোত্তর নতুন জীবনের শুরু করেন কেক কেটে।

আড্ডার শেষের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ বাইরে থেকে আসা বিভিন্ন শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তর দেন জাফর ইকবাল।

তিনি বলেন, “আনুষ্ঠানিকভাবে আজ আমার শিক্ষকতার জীবন শেষ। আমাকে আর কোনো কাগজে সাইন করতে হবে না। তবে আমি বিভাগে থাকব। ক্লাস নেব। এখানকার বাসাতেই থাকব।”

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here