ভোট থেকে ছিটকে গেলেন ‘নামিদামি’ যারা

    0
    0

    অনলাইন ডেস্কঃ
    মামলায় দণ্ড আর খেলাপি ঋণ, তথ্যে অসঙ্গতিসহ বিভিন্ন কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠ থেকে ছিটকে পড়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ কয়েক ডজন নামিদামি প্রার্থী।

    রোববার সারাদেশে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বাদ পড়াদের নাম ঘোষণা করা হয়।

    তফসিল অনুযায়ী ২৮ নভেম্বর মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় পর্যন্ত সারা দেশে ৩৯টি দলের মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মোট ৩ হাজার ৬৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে এবার।

    এবার বাছাই শেষে বাদ পড়েছে ৭৮৬টি মনোনয়নপত্র। ফলে বৈধ প্রার্থী হিসেবে এখনও মনোনয়নের দৌড়ে থাকছেন ২ হাজার ২৭৯ জন।

    নির্বাচন বিধি অনুযায়ী, বাছাইয়ে বাদ পড়া প্রার্থীরা তিন দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন। ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে সেসব আপিল নিষ্পত্তি করা হবে এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

    পরদিন প্রতীক বরাদ্দ হলে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারে নামতে পারবেন। সব প্রস্তুতি শেষে ৩০ ডিসেম্বর হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ।

    দুই মামলায় ১৭ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষে এবার তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল।

    দুর্নীতি মামলায় দুই বছরের বেশি সাজা হওয়ায় ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

    খালেদার অবর্তমানে বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে রইলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

    খালেদার বিকল্প হিসাবে ফেনী-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্রের বৈধতা পেয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মজনু।

    খালেদার পাশাপাশি তার বিকল্প প্রার্থী গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মোরশেদ মিল্টনের মনোনয়নপত্রও বাতিল হওয়ায় বগুড়া-৭ আসনে ধানের শীষের কোনো প্রার্থী থাকলো না।

    মামলায় দণ্ড ও বিভিন্ন কারণে মনোনয়নপত্র বাতিলের শঙ্কায় এবার অধিকাংশ আসনেই একাধিক প্রার্থী রেখেছিল বিএনপি। বাদ পড়াদের তালিকায় তাদের সংখ্যাই বেশি।

    সরকারবিরোধীদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেক ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী বাদ পড়ায় বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, তাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বতিলের বিষয়টি ‘সরকারের নীল নকশারই’ অংশ।

    তিনি বলেন, কেবল বেগম জিয়া নয়, ‘বেছে বেছে’ তাদের জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে।

    “এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দুরভিসন্ধিমূলক। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার যে বিপুল জনপ্রিয়তা, সেই জনপ্রিয়তা থেকে তাকে দূরে সরানোর যে মাস্টারপ্ল্যান সরকার করেছে, সে নীল নকশার অংশ বলে আমরা মনে করি।”

    অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলেছে, দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত খালেদার মনোনয়নপত্র বাতিলের মধ্য দিয়ে ‘সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ’ নিশ্চিত হয়েছে।

    রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকারও প্রমাণ মিলেছে বলে মন্তব্য করেছেন দলটির নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত উপকমিটির চেয়ারম্যান ফারুক খান।

    রোববার নির্বাচন কমিশনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটাই লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড। আইন সকলের জন্য এক। কোনো একটি দলের প্রধান হলেই তার জন্য তো আইন অন্য রকম হবে না। এতে প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে।”

    পটুয়াখালী-১ আসনের বর্তমান সাংসদ জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে ‘ঋণখেলাপী’ হওয়ার কারণে।

    টাঙ্গাইলের দুটি আসনে মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণে ভোটের মাঠে থাকতে পারছেন না কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকী।

    ভোটের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেওয়া সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা কাদের সিদ্দিকীর টাঙ্গাইল-৪ ও ৮ আসনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ঋণ খেলাপের অভিযোগে।

    টেলিফোন বিল বকেয়া ও ঋণ খেলাপি হওয়ায় ঢাকা-৯ আসনে ধানের শীষের টিকেট পাওয়া মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।

    আর ঢাকা-২ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দুর্নীতি মামলায় ১০ বছর সাজা হওয়ায়।

    অবশ্য ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীর চরের এই আসনে মনোনয়নপত্রের বৈধতা পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকছেন আমানের ছেলে ইরফান ইবনে আমান অমিত।

    ঢাকা-১৭ আসনে জমা দেওয়া ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন ঢাকা মহানগরের রিটার্নিং কর্মকর্তা।

    মনোনয়নপত্রে কোনো দলের নাম কিংবা স্বতন্ত্র হিসাবেও উল্লেখ না থাকায় তৃণমূল বিএনপির প্রধানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।

    ঢাকা-২০ আসনে ধামরাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি তমিজ উদ্দিন ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহম্মেদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল মান্নানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

    বিএনপি প্রয়াত নেতা নাসিরউদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী ঢাকার সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার নাসিমা আক্তার কল্পনা ঢাকা ৭ আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন পেলেও তার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে খেলাপি ঋণের কারণে।

    ঢাকা ৬ আসনে ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনের মনোনয়নপত্রও এক লাখ টাকা ঋণ খেলাপের কারণে বাতিল হয়েছে।

    একই কারণে ঢাকা-৫ আসনে নির্বাচনের দৌড় থেকে বাদ পড়েছেন বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া।

    ভোটের মাঠে এসে টিকতে পারলেন না আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া। ক্রেডিট কার্ডের ঋণ বকেয়া থাকায় হবিগঞ্জ-৩ আসনে গণফোরামের এই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।

    একই আসনে সংরক্ষিত নারী আসনের বর্তমান সাংসদ আওয়ামী লীগের আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন; সেটাও বাতিল হয়েছে হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকায়।

    ভোটের আগে বিএনপিতে আসা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ গোলাম মাওলা রনির মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ‘হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকায়’।

    পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে নবম সংসদের এই সাংসদ।

    চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে জমা পড়া ১৮০টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ৪১টি বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। তার মধ্যে ১১টিই বিএনপি নেতাদের।

    যুদ্ধাপরাধে ফাঁসির দড়িতে ঝোলা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বাদ পড়েছেন খেলাপি ঋণের কারণে।

    গিয়াসের সঙ্গে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির টিকেট পাওয়া তার ছেলে সামির কাদের চৌধুরীর মনোনয়নপত্রও একই কারণে বাতিল হয়েছে।

    সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে বিএনপি নেতা মীর মো. নাছির উদ্দিন ও তার ছেলে মীর মো. হেলাল উদ্দিন দুজনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। দুর্নীতি মামলায় সাজার কারণে দুজনের প্রার্থিতাই বাতিল হয়েছে।

    চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া সাবেক মন্ত্রী মোরশেদ খান খেলাপি ঋণের কারণে এবং আরেক বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহ ব্যাংক হিসাব না খোলায় অযোগ্যে ঘোষিত হয়েছেন।

    চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড-কাট্টলী) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর মনোনয়ন পত্র ঋণ খেলাপের কারণে বাতিল হয়েছে।

    মামলার তথ্য গোপন করায় রাজশাহী-১ আসনে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের এবং ঋণ খেলাপী হওয়ায় রাজশাহী-৫ আসনে বিএনপির সাবেক এমপি নাদিম মোস্তফার এবার নির্বাচন করা হচ্ছে না।

    নাটোর-২ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দুটি মামলায় দুই বছরের বেশি সাজা হওয়ার কারণে।

    অবশ্য সদর ও নলডাঙ্গা এলাকা নিয়ে গঠিত ওই আসনে দুলুর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিনের মনোনয়নপত্র বৈধতা পেয়েছে।

    নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েও প্রার্থিতা টেকাতে পারেননি গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার।

    ভোটারদের এক শতাংশ সমর্থনে ‘ত্রুটি থাকার’ কারণে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

    এদিকে, মানিকগঞ্জে দলের সাতজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের প্রতিবাদ জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে বিএনপি।

    মহাসচিব মির্জা ফখরুলের স্বাক্ষর নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে মানিকগঞ্জের তিনটি আসনে বিএনপির ওই সাত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেন জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা।

    ওই মনোনয়নপত্রগুলো গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে চিঠিতে মির্জা ফখরুল লিখেছেন, “আমি দৃঢ়তার সাথে জানাচ্ছি যে, মানিকগঞ্জ জেলার প্রতিটি আসনে মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীগণ আমার সুপরিচিত এবং আমি নিজে তাদের মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেছি, এ বিষয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।”

    সূত্রঃ বিডিনিউজ

    একটি উত্তর ত্যাগ

    Please enter your comment!
    Please enter your name here