মনের কথার ভাষা

0
0

হাসনাত আবদুল হাইঃ
কথা মানুষের নিত্যসঙ্গী। এই কথা কখনও সরব, কখনও নীরব। যখন নীরব মনো মধ্যেই জমে থাকে কথা, সেখানেই তার আশ্রয়, কিন্তু সে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে চায় না, তার রয়েছে বিবাগী, অনিকেত এক চরিত্র। যে যার মতো হয়ে বাড়তে চায়, সরব হতে মনকে হালকা করেও চলতে চায়। ঘরকুনো একা সে, ভবঘুরে নয়। তার লক্ষ্য নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়া। কথা সদাই উন্মুখ। মনে জমে থাকা তার কথা শান্তির মতো, অশান্তির কারণও বটে। বলাতেই তার মুক্তি। কবি সেই জন্য লিখেছেন, আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল শুধাইলো না কেহ। আহা! কথা এর চেয়ে বেশ দারুণভাবে জমে; কেমন করেই-বা নিজেকে তখন করতে পারে ধনী-নির্ধন। যেই হোক না কেন, কথা ছাড়া তার জীবনযাপন হয় না। এমনকি যে কথা বলার ক্ষমতা না নিয়ে জন্মেছে, অথবা জন্মাবার পর সেই ক্ষমতা হারিয়েছে তাকেও কথা বলতে হয়, বাঁচবার জন্য, উভয় অর্থেই শারীরিক এবং মানসিক কারণে। যার বাকশক্তি নেই, সে কথা বলে মনে মনে স্বগত সংলাপে অথবা অন্যের সঙ্গে হাত নেড়ে, চোখের ভাষায়।

মনের কথা বলার জন্য ভাষার প্রয়োজন হয় না। কথা বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে দেহভঙ্গির হতে ধরে অথবা কেবলই চোখের তারা নাড়িয়ে। চোখের ভাষায় শুধু নির্বাক যারা, তারা কথা বলে না। এই ভাষা প্রেমিক-প্রেমিকাদের কাছে খুবই প্রিয়, অন্তত একদা তাই ছিল। জগৎ সংসারে যখন তারা মুখ ফুটে মনে জমে থাকা কথা বলতে সাহস পায়নি, হয়তো বলেছে, চঞ্চল হয়ে পড়েছে কখনও কখনও। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হলেও তারা নিজেদের মনের কথা বলার একটা ভাষা তৈরি করে নিয়েছে। নির্বাক মুহূর্তে অনেকের ভিড়ে থেকে তারা গোপনে চোখের ভাষা বিনিময় করেছে, দৃষ্টি হেনে মনের ভেতরে থাকা কথা বলে বলে।

মনে জমে থাকা কথা প্রসঙ্গে প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিষয়টা ভিন্ন। তাদের মনে যে কথাই জমে থাকুক না কেন তারা তাদের মত তা প্রকাশ করেই থাকে। তাদের মনে যে কথা জমে থাকে নিরন্তর, হাজার কথা বলার পরও তাদের জমানো কথা কি শেষ হয়? একসময় প্রেমিক-প্রেমিকারা চিঠি লিখে মনে জমে থাকা কথা জানাত একে অন্যকে। দীর্ঘ হতো সেই চিঠির কলেবর, এত লিখেও যেন মনের সব কথা ফুরাত না। কথা বলার সুযোগ না পেয়ে মনের কথা চিঠিতে লেখা হতো নিরবচ্ছিন্নভাবে। ধারাবাহিক ও একের পর এক। রুদ্ধ মনের কথা সব বেরিয়ে আসত সাদা কাগজে কালো হরফে লাইন করে। ডাক হরকরা সেই চিঠি বিলি করতে গিয়ে যেন ফুরসত পেত না। চিঠি এলে চোখে মুখে উদ্বিগ্নতা ফুটে উঠত। কিন্তু কাছে এসে হাতে তুলে দেওয়ার সময় ঠিক অন্যরকম হাসির ঝলকানি। প্রেমের না হোক, কথা মনে মনেও তো অনেক বলা হয়। তবুও অনেকে না পারে বলতে, না পারে চিঠির ভাষায় লিখতে। অন্যের চিঠি বিলি করে তাদের মনের কথা মনে করে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েই তার আনন্দ।

যখন টেলিফোন সংযোগ পাওয়া গেল বাড়িতে, প্রেমিক-প্রেমিকা জানল এবার চিঠি লেখার দিন ফুরলো। লেখা বা মুখের ভাষাতেই কথা বলা যাবে দূরালাপনীতে। দূরালাপনী? আহা হোক না তারে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর! তবুও কেন যেন দূরের মনে হচ্ছে না, খুব অন্তরঙ্গ মনে হচ্ছে। শোনাও যাচ্ছে যেন কাছে থেকেই। কিন্তু টেলিফোনে মনে জমে থাকা কথা বলতে সুযোগ এনে দিল না। কথা জমেই থাকল মনে। টেলিফোনে তো কথা হয়েও হয় না। সুযোগ পাওয়া যায় না। টেলিফোন ধরার প্রশ্রয় কি থাকে? না, থাকে না? টেলিফোনে একান্তে প্রেমিক-প্রেমিকা কথা বলতে গিয়েও তেমন কোনো পরিবর্তন এলো না। এখানে সবার কথা উন্মুক্ত। কেবল একজনের ইচ্ছেমতো গোপনে কথা বলার জন্য নয়। মুঠোফোন এসে যেন সেই সমস্যার সমাধান করে দিল। এখন হাতে হাতে নিজের ফোন, যা ইচ্ছেমতো যখন খুশি, যেখানে ইচ্ছা ব্যবহার করে কথা বলা যায়। টেলিফোনের মতো সহজে। কিন্তু মনে জমে থাকা কথা মোবাইলের যুগে এসে মুক্তি পেল না। কেননা মোবাইলে কথা হলো সাংকেতিক ভাষায়, সংক্ষিপ্ত আকারে। নানান কথা ভেবে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করার উপায় থাকল না। মুঠোফোনে অনেকের সংক্ষিপ্ততা, তৃপ্তির চেয়ে অতৃপ্তির ঘটনাই ঘটল বেশি। প্রেমিক-প্রেমিকার মনের কথা আজও রুদ্ধ হয়ে থাকল মনের ভেতর। এ হয়তো গুমরে মরল আগের মতোই। এখন স্মার্টফোনের আকারে এলো তখনও বড় কোনো পরিবর্তন এলো না সংলাপে, বরং নানা ধরনের সংক্ষিপ্তকরণ শুরু হলো। যেমন একটি মাত্র শব্দ থ্যাঙ্কস পড়তে হলো তিনটি অক্ষরে। যাতে অর্থ বোঝা গেল, কিন্তু তাদের উত্তাপ টের পাওয়া গেল না। সেই যেমন যাযাবর অনেক আগে ‘দৃষ্টিপাতে’ লিখেছিলেন।

মনের কথা বলার আকুলতা কেমন, প্রেমিক-প্রেমিকাই নয়, সংসারের সকল শ্রেণির, সব বয়সের মানুষেরাই অস্বস্তিতে থাকে। এত কথা কোথা থেকে আসবে? চারদিক থেকে আসে। এ তো নতুন কিছু নয়, অনাদিকাল থেকেই এমন চলে আসছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যা দেখা হয়, যা কানে আসে, যা মনে হয় অতীত থেকে মনের ভেতর জমে থাকা কথা হয়ে। শুধু তাই নয়, কথার পিঠে কথা জমে ওঠে। যেসব সহোদর-সহোদরা, এটাই তাদের স্বভাব কিংবা বৈশিষ্ট্য। পিতামহ কি মাতামহী তার স্মৃতির কথা বলতে চান দৌহিত্র-দৌহিত্রীর কাছে। তাদের কেউ অনেক আগ্রহ দেখায়, কেউ ব্যস্ততার অজুহাতে চলে যায় না শুনে। স্মৃতিমেদুর মানুষগুলো তখন একান্তে মনে জমে থাকা কথা নিয়ে তড়পায়। যারা লিখতে পারেন, স্মৃতিকথা লিখতে বসেন। অনেকটা নিরুপায় হয়ে, কেউ বা ফরমায়েশে। স্মৃতিকথা নিয়ে এই মনে জমে থাকা কথার শুরু, কিন্তু এরূপ হয় না। মনের ভাব মনেই জমে থাকে কমে না, লিখতে লিখতে যে ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে তার অনেক কিছুই অব্যক্ত থেকে যায়। স্মৃতিকথা যারা লিখতে পারেন, তারা সে জন্য এক ধরনের গৌরব বোধে তৃপ্তবোধ করেন। স্মৃতিকথা লেখার বিষয়টি কথাকে মুক্তি দেওয়ার একটা উৎস। যারা পারে তাদের কাছে বোঝা বলে মনে হয় না। স্মৃতিকথা লিখে বরং হালকা হয়ে ওঠেন তারা। অন্তত অতীতের জমে থাকা কথার প্রসঙ্গে।

যেসব কথা খুব গোপন সেগুলো জমেই থাকে। সুযোগ নেই মুক্তির। কখনও সেই মুক্তি আসে ধমকানির ফোনে অথবা সান্ধ্য আড্ডায়। সান্ধ্য আড্ডার আয়োজন যেমন প্রবীণদের জন্য। অন্যদিকে যুবকদের আড্ডা প্রতিনিয়তই চলে, রেস্তোরাঁয়, ফুটপাতে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে কিংবা করিডরে। তখন কি যুবক বয়সের ওই সময়ের মনে জমে থাকা কথা বলার সুযোগ তাদের হাতের কাছেই থাকে?

শহরে এখন নেই, আগেও ছিল না, কিন্তু গ্রামে একসময় খুব দেখা যেত। জনপ্রিয় ছিল ব্যাপারটা। পুঁথিপাঠ। সোনাভান থেকে নানা লোককাহিনীর পুঁথি পাঠের আসরে অনেকে সমবেত হতো। মনের অনেক জমে থাকা কথা বেরিয়ে আসত। আসরে জমে যেত সেইসব কথায়। এ ছিল এক ধরনের বেদনার্ত গল্প যা এক ট্র্যাজেডির নাটক থেকে দর্শকদের মনের প্রকাশ হিসেবে দেখা দিত। কবির লড়াইও এ ধরনের মনের জমে থাকা কথা মুক্তি পাওয়ার সুযোগ এনে দিত গ্রামের নিরক্ষর সাধারণ মানুষের সামনে।

মনে জমে থাকা কথা যেমন একান্তে জমেই থাকে। বরং স্মৃতিচারণে সেইসব কথা বেরিয়ে আসে। হাটে-গঞ্জে, সড়কের চায়ের দোকানে বসেও সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় সেইসব কথা। সাধারণ মানুষের কাছে এটাই সবচেয়ে প্রিয় আড্ডা যেখানে রাখঢাক না থাকে, মনের কথা বলার সুযোগ পেয়ে সবাই নিজের মতো বলে। সবাই এ বিষয়ে একই রকম পারঙ্গম নয়, কেউ যেন পেশাদার শিল্পীর মতো মনে জমে থাকা কথা অনায়াসে বলে যায় অন্যেরা উৎকর্ণ হয়ে তার কথা শোনে। আর অনেকে তাদের মনের কথাও ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না- তাই শ্রোতা হিসেবেই তারা অন্যের মনে জমে থাকা কথা শোনে। সেই কথা পুরনো হলো, না সদ্য ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার বর্ণনা সেটা বড় কথা নয়। অন্য কোনো অভিজ্ঞতার কথাও হতো হাটে-গঞ্জে অথবা সড়কের চায়ের দোকানে। তাদের জন্য চায়ের দোকানই হলো মনের জমে থাকা কথা বলার নিরাপদ আশ্রয়।

জমে থাকা কথা বলার ক্ষেত্রে নাপিত যেন সৌভাগ্যবান। তার কথা জমে থাকে না। চুল কাটাতে যারা আসে তাদেরকে সে বলে যায়। আয়নার সামনে সে খোঁজে তার মনের কথা বলার সঙ্গী। বলে যায় অনর্গল। যেখানে কৌতুক থাকে, থাকে হাস্যরস। শহরের ট্যাক্সি ড্রাইভারও এভাবে গাড়ি চালাতে চালাতে আরোহীদের কথা শোনায়।

মনের জমে থাকা কথা বলার জন্য অনেকেই ব্যাকুল, শোনার মানুষ সেই তুলনায় কম। যারা কথা বলতে চায় তারা প্রায়ই কথা শোনাবার মতো কাউকে পেলে তাকে ছাড়তেই চায় না। সে জন্য বাড়ির সামনে কেউ কেউ লিখে রাখে ‘পর্যাপ্ত সময় না থাকলে এখানে আসবেন না’।

এই যে এতক্ষণ যা ইচ্ছা তাই লিখে গেলাম আমি! আমার মনে জমে থাকা সব কথা তাও কি বলা হলো? হলো না, এ তো উপক্রমনিকার মতো। এপিসাইডাল।

মানুষ আজ বড় নিঃসঙ্গ, একাকী। না, আমি কিন্তু একাকী নিঃসঙ্গ নই। আমার রয়েছে অনেক বই। অনেক অনেক চরিত্র। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে দিব্যি সময় কাটিয়ে দিতে পারি। এরই মধ্যে লিখিও বটে। কথা কখনও মনের ভেতর জমে থাকতে পারে না। লেখক হলে নগদ প্রাপ্তির সুযোগ কম এদেশে। কিন্তু মনে জমে থাকা কথা বলার চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। ধন্যবাদ, যারা শুনলেন মানে পড়লেন এই এলোমেলো লেখাটা।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here