হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরাঃ ভূমি কমিশন গঠনের দাবি

0
6

বিশেষ প্রতিবেদনঃ
‘জমি চাই মুক্তি চাই’ স্লোগানে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল নেতা সিধু, কানু, ভৈরব ও চাঁদ- চার ভাই ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ইতিহাসে তা ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। ওই আন্দোলনে আত্মোৎসর্গ করে গেছেন তারাসহ বহু মানুষ। আত্মদানে মহীয়ান ওই বিদ্রোহের ১৬৩ বছর পরও সেই ভূমির জন্যই স্বাধীন বাংলাদেশে আজও জীবন দিতে হচ্ছে সমতলের আদিবাসীদের। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৪ সালে পিতা ফাগু সরেন এবং ২০১১ সালে বড় ভাই গোসাই সরেনকে হারিয়েছেন দিনাজপুরের আদিবাসী কৃষক টুডু সরেন। ২০১৪ সালে নিজেও খুন হন। তার স্ত্রীর ওপর হামলা হয়েছে, কিন্তু ভূমি রক্ষা হয়নি। ভূমিদস্যুরা জাল দলিলের মাধ্যমে টুডু সরেনের ৩৩ একর জমি দখল করে নিয়েছে। নিজেদের বসতভিটা সরকারের অধিগ্রহণের প্রতিবাদে জীবন দিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের পিরেন স্ন্যাল। জমি ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে ২০১৬ সলে গাইবান্ধায় পুলিশের গুলিতে জীবন হারিয়েছেন তিন সাঁওতাল। এভাবে প্রায়ই মামলা-হামলা, অত্যাচার-নির্যাতনে ভূমিহীন হচ্ছেন সমতলের আদিবাসীরা, যেসব জমিতে শত শত বছর ধরে তারা বাস করেছেন।

ভূমি হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে আদিবাসীরা। কারণ এই ভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তাদের জীবন ও সংস্কৃতি। জমির সঙ্গে সঙ্গে কমছে আদিবাসীদের সংখ্যাও। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল, দক্ষিণাঞ্চলের রাখাইন, মধ্যাঞ্চলের গারোদের মতো সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দখলি জমি যেমন কমছে, তেমনি কমছে তাদের জনসংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদিবাসীদের জীবনবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। এ জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভূমিহীন হচ্ছে আদিবাসীরা :দেশের আদিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে নিখুঁত কোনো পরিসংখ্যান নেই। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে দেশে প্রায় ১৬ লাখ আদিবাসী রয়েছে। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি, দেশে ৫৪টির বেশি জাতিসত্তার ৩০ লাখ আদিবাসী রয়েছে। এর মধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দুই-তৃতীয়াংশের বসবাস। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের তথ্যমতে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় ৩৮টি জাতিসত্তার ২০ লাখ আদিবাসী বসবাস করে। এদের মধ্যে রয়েছে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, রাজোয়াড়, তুরি, কর্মকার, মালো, মাহাতো, চাঁই, বাইছনী, লহরা, হাঁড়ি, ঘাটোয়াল, দোষাদ, চাঁড়াল, ডহরা, ভূমিজ, মালপাহাড়িয়া, গন্ড, পাটনি,

বাগদি, মাহালী, মুসহর, ভুঁইমালি, কোচ, তেলী, গোড়াত, বেতিয়া, নুনিয়াহাড়ি, রাজবংশী, পাহাড়িয়া, ভূঁঁইয়া, রবিদাস, রাই, বেদিয়া ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় রাখাইনদের বসবাস। টাঙ্গাইলের মধুপুর জঙ্গল ঘিরে গড়ে উঠেছে গারো ও কোচ আদিবাসীদের গ্রাম। এই আদিবাসীরা প্রধানত কৃষি ও ভূমির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের দাবি, এক সময় যথেষ্ট জমি থাকলেও বর্তমানে তাদের ৮৫ শতাংশই ভূমিহীন। ‘আদিবাসী মানুষের ভূমি অধিকার-উন্নয়ন-মানবাধিকার’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেছেন, সমতলের সাঁওতালদের ৭২ শতাংশ, পাত্র ও পাহান খানাদের ৯০ শতাংশ এবং গারো, হাজং, ডালু ও রাখাইনদের ৬৬ শতাংশের বেশি লোক বর্তমানে ভূমিহীন।

আবুল বারকাত তার আরেক গবেষণায় দেখিয়েছেন, সমতলের ১০ আদিবাসী জনগোষ্ঠী গত কয়েক দশকে ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ বিঘা জমি হারিয়েছে। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী যার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাঁওতালরা। গত তিন প্রজন্মে তাদের তিন লাখ বিঘা জমি বেহাত হয়েছে, যার বাজারমূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

যেভাবে ভূমি হারাচ্ছে আদিবাসী :পেছনে ফিরলে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মতো আদিবাসী জনগণও নিজেদের জমি হারিয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর আরেক দফা বাস্তুচ্যুত হয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লোকেরা। প্রভাবশালীদের ষড়যন্ত্র, মামলা-হামলার পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষার অভাব, অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও দারিদ্র্যের কারণে ভূমিহীন হচ্ছে আদিবাসী। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধকি জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয় তারা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা জাল দলিল করে, মামালা-হামলার মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং ভূমি অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় এসব জমি দখল করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র বর্মণ বলেন, শিক্ষার অভাবে আদিবাসীদের জমি বেহাত হচ্ছে। তিনি তার এক আত্মীয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সে বিক্রি করেছিল পাঁচ শতাংশ জমি। ক্রেতা ৫-এর পর আরেকটি ৫ বসিয়ে ৫৫ শতাংশ জমি হাতিয়ে নিয়েছে।

অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত তার এক গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ১৬টি কারণে আদিবাসীরা ভূমিহীন হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে- নিরক্ষতা, জমির দলিল না থাকা, আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব, প্রভাবশালী রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক শক্তির অত্যাচারসহ নানা কারণে আদিবাসী গোষ্ঠীর লোকজন বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংরক্ষিত বন গড়ে তুলতে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় মধুপুর বনের ৯ হাজার ১৪৫ একর জমি সংরক্ষণের জন্য ২০১৬ সালে গেজেট প্রকাশ করায় গেজেটের আওতাভুক্ত ১৩ গ্রামের গারো ও কোচ নৃগোষ্ঠীর এক হাজার ৮৩ পরিবারের ছয় হাজার অধিবাসী এখন উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, সংরক্ষিত বন ঘোষণার প্রতিবাদ করায় ২০১৬ সালে ইউজিন নকরেকসহ ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

পটুয়াখালীর পাহাম হালিবাট বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উথা চিং বলেন, ভুয়া দলিল ও মামলার মাধ্যমে হয়রানি করে রাখাইনদের ভূমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, মিথ্যা মামলাসহ নারীদের শ্নীলতাহানি, ধর্ষণ, লোকজনকে হত্যার মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি দখল করা হয়। এ নিয়ে সুবিচার পান না বলে তিনি অভিযোগ করেন। ২০০১ সালে নওগাঁর মহাদেবপুরে আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে হত্যার পর দেড় যুগেও তার বিচার হয়নি।

অস্তিত্ব সংকটে আদিবাসীরা :গবেষকদের মতে, ১৯ শতকের গোড়ার দিকে পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলীয় এলাকায় ৫০ সহস্রাধিক রাখাইন জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। ৭০ দশকেও তাদের জনসংখ্যা ছিল ৪০ সহস্রাধিক। বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের ২০১৪ সালে পরিচালিত জরিপমতে, উপকূলীয় অঞ্চলে আড়াই হাজার রাখাইন রয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে এক সময় ২৪২টি রাখাইন গ্রাম ছিল। এর মধ্যে ১৯৫টিতে এখন রাখাইন বসতি নেই। এভাবে গত ২০০ বছরে ৮০ ভাগ রাখাইন গ্রাম তাদের হাতছাড়া হয়েছে। জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৯০ শতাংশ। শুধু রাখাইন নয়; সাঁওতাল, ওঁরাও, গারো, মাহাতো, মাহালি, রাজবংশীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠী অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। ধীরে ধীরে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একেএম শাহনাওয়াজ বলেন, সাঁওতালরাই এদেশের আসল ভূমিপুত্র। সাঁওতালরা হাজার বছর ধরে তীর-ধনুক দিয়ে আর্যদের ঠেকিয়েছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছে। তীর-ধনুক নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কিন্তু তারাই এখন নিজভূমে সংখ্যালঘু।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে শুধু জীবিকাই নয়, জড়িয়ে আছে আবেগ, ধর্ম, সংস্কৃৃতি। এখান থেকে বিতাড়িত হওয়া মানে শিকড় কেটে যাওয়া। আদিবাসীদের কাছে ভূমি হলো তাদের অস্তিত্বের বিষয়।

আইনগত সমাধান ও ভূমি কমিশন গঠন :পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আদিবাসীদের রক্ষায় আইন বা বিধিবিধান যুগোপযোগী করে পূর্বপুরুষদের প্রথাগত ভূমির ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় তাদের জন্য বিশেষ আইন করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন- জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বসবাসরত ভূমির ওপর তাদের আইনি অধিকার আছে। কেনিয়ার ওজিয়েক ও বতসোয়ানার বাসারওয়া সান জনগোষ্ঠীকে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে সরিয়ে সংরক্ষিত পার্ক প্রতিষ্ঠা আদালতের মাধ্যমে বেআইন ঘোষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষায় আইন রয়েছে। এর যথাযথ প্রয়োগ হলে আদিবাসীদের ভূমি বেহাত হওয়া অনেকাংশেই থামানো যাবে।

এ বিষয়ে আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সমতলের আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষার জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।

সূত্রঃ সমকাল

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here