আজ শুধু ভালোবাসা

0
14

সাব্বির নেওয়াজঃ
‘যুগে যুগে লোক গিয়েছে এসেছে/দুখিরা কেঁদেছে, সুখীরা হেসেছে/প্রেমিক যেজন ভালো সে বেসেছে/ আজি আমাদেরই মতো/তারা গেছে, শুধু তাহাদের গান/দু’হাতে ছড়ায়ে, করে গেছে দান/দেশে দেশে তার নাহি পরিমাণ/ভেসে ভেসে যায় কত’-বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এমন তীব্র প্রেমময় আকুতি আজ ছড়িয়ে আছে চারপাশে। দেশে দেশে আজ ভালোবাসায় উজ্জীবনের নতুন আবেশ। চারিদিকে। পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর কোমল দুরন্ত মানবিক অনুভূতি আর সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত শব্দমালা এই ভালোবাসা। যা মানুষকে সাহস জোগায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার, শক্তি জোগায় শোক, ব্যথা আর হতাশার মধ্যেও বেঁচে থাকার। বসন্তের আবির মেখে আবারও ফিরে এসেছে সেই ভালোবাসার দিন। আজ সেই ভালোবাসা দিবস।

বসন্তময় এই ভালোবাসার দিনে আজ অনুরাগতাড়িত সব হৃদয় এফোঁড়-ওফোঁড় হবে দেবতা কিউপিডের বাঁকা ইশারায়। এই ভালোবাসা শুধু কেবল তরুণ-তরুণীর নয়, ‘বয়সীদের তরুণদের’ জন্যও বটে। হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, ‘বুড়ো হয়ে গেছি বেশ/কিছুটা শিথিল; বুঝতে পারিনি তাই/তোমার একুশতম জন্মদিনে, তিলোত্তমা, কী নিয়ে যাই/তুমি ঘাসফুল, স্বর্ণলতা, রোদ, পৌষের তুষের আগুন/কোকিলের ডাক, কৃষ্ণচূড়া, রক্তজবা, নদী, রঙিন ফাগুন।’

আজ প্রেমিক যুগলদের পদচারণায় মুখর হবে পার্ক আর বিনোদন কেন্দ্রগুলো। বই বা কার্ডের ফাঁকে ভালোবাসায় সিক্ত গোলাপকলি গুঁজে দিয়ে তারা একে অপরকে জানাবে ভালোবাসা। ছয় ঋতুর মধ্যে বসন্ত প্রেম ও রোমান্টিকতার প্রতীক হিসেবে পরিগণিত। এ সময় ফুলে ভরা প্রকৃতির প্রভাবে মানুষের মনও হু হু করে ওঠে।

ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে পহেলা ফাল্কগ্দুন তথা বসন্তের কালগত নৈকট্য কাকতাল মাত্র। কারণ কয়েক বছর আগেও এ দেশে এ দিবসটির তেমন তাৎপর্য ছিল না। আশির দশকে এ দিনটি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবেই বাংলাদেশে বেশি পালিত হতো। কিন্তু নব্বইয়ের মাঝামাঝি কাল থেকে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এবং আকাশ-সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলাদেশেও ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হিসেবে উদযাপিত হতে থাকে। সম্প্রতি তা বিশেষত তরুণ-তরুণীদের কাছে অবশ্য পালনীয় হয়ে উঠেছে।

গত কয়েক দিন ধরে নগরীর বিভিন্ন বিপণিবিতানে ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে তরুণ-তরুণীদের বিভিন্ন কার্ড, শোপিসসহ নানা উপহারসামগ্রী কিনতে দেখা গেছে। জনপ্রিয় কার্ড ও উপহারসামগ্রী বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান আর্চিস গ্যালারি ও হলমার্কের শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, এ দিবস উপলক্ষে বিপণনের জন্য বিভিন্ন কার্ডসহ নানা উপহারসামগ্রী সাজিয়ে রাখা হয়েছে। রাজধানীর আরও কয়েকটি বিপণিবিতানেও এ ধরনের কয়েকটি দোকানে তরুণ-তরুণীর ভিড় দেখা গেছে। বিক্রেতারা জানান, দিবসটি ঘিরে প্রচুর কার্ড ও উপহারসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। এসব কার্ড বা উপহারসামগ্রী দূরের প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেককে পোস্ট অফিস ও কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানেও ভিড় করতে দেখা গেছে।

ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। নাম করা হোটেল ও রেস্টুরেন্ট বিশেষ লাঞ্চ এবং ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ব্যবস্থা করেছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও বেতার কেন্দ্র প্রচার করবে বিশেষ অনুষ্ঠান। ফোন কোম্পানিগুলো ঘোষণা করেছে বিশেষ প্যাকেজ।

ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় নানা কাহিনী। সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনী হচ্ছে রোমান একজন ক্রিশ্চিয়ান পাদ্রিকে ঘিরে। তার নাম সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। এই পাদ্রি চিকিৎসকও ছিলেন। খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের অভিযোগে ২৭০ খ্রিষ্টাব্দে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন রোমের দ্বিতীয় ক্লডিয়াস। তিনি যখন কারাগারে বন্দি ছিলেন, তখন ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে জানালা দিয়ে চিঠি ছুড়ে দিত। কারাগারে বন্দি অবস্থায় চিকিৎসা করে জেলারের মেয়ের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন এই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। চিকিৎসার সময় মেয়েটির সঙ্গে নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে তার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে মেয়েটিকে তিনি যে চিঠি লেখেন, তার নিচে লেখা ছিল, ‘ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন’। অনেকে মনে করেন, সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারেই প্রথম জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ইতিহাসে আরও একজন ভ্যালেন্টাইন রয়েছেন। যুদ্ধের জন্য দক্ষ সৈনিক সংগ্রহের জন্য রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস যুবকদের বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। কিন্তু এ ভ্যালেন্টাইন নিয়ম ভঙ্গ করে প্রেম ও বিয়ে করেন। ফলে তার মৃত্যুদণ্ড হয়।

পুরনো ধারণা মতে, ১৪ ফেব্রুয়ারি পাখিরা সঙ্গী বেছে নেয়। এ দিনটি তাই নিবেদনের সবচেয়ে উপযুক্ত দিবস। এদিন রোমানরা বাক্সের ভেতর নাম রেখে লটারি করে তাদের প্রিয়তম বা প্রিয়তমাকে বেছে নিতো। ১৭০০ সালের দিকে ইংরেজ নারীরা কাগজে তাদের পরিচিত পুরুষদের নাম লিখে কাদামাটি মিশিয়ে পানিতে ছুড়ে মারত। যার নাম সবার আগে ভেসে উঠত, সেই হতো প্রকৃত প্রিয়তম বা প্রিয়তমা।

এমন সব মিথকে ঘিরে বিকশিত সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ছড়িয়ে পড়েছে এখন সারা বিশ্বে। অবগুণ্ঠিত জীবনে প্রেমপিয়াসী হৃদয় বছরের এই একটি দিনকে বেছে নিয়েছে অন্তরের ব্যাকুল কথার কলি ফোটাতে। ভালোবাসার এই দিনে আজ হৃদয়গহনে তারাপুঞ্জের মতো ফুটবে সেই অনাদিকালের সুর। আজ বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতা-অনানুষ্ঠানিকতায় ভালোবাসার উৎসবে মুখর হবে জনপদ। হাইটেকের ডিজিটাল সময়ে মুঠোফোনের মেসেজ বার্তা, ই-মেইল অথবা অনলাইনের চ্যাটিংয়ে পুঞ্জ পুঞ্জ পল্লবিত হয়ে উঠবে প্রেমকথার কিশলয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here