অভিজিৎ হত্যা : মেজর জিয়াসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

0
9

অনলাইন ডেস্কঃ
ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে জিয়াসহ (চাকরিচ্যুত মেজর) ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। অপরদিকে সাদেক আলী ওরফে মিঠুসহ ১৫ জনকে অব্যাহতির আবেদন করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

বুধবার (১৩ মার্চ) ঢাকা মহানগর হাকিম সরাফুজ্জামান আনসারীর আদালতে এই চার্জশিটটি দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৩৪ জনকে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি জন্য আগামী ২৫ মার্চ দিন ধার্য রয়েছে।

শাহবাগ থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক নিজাম উদ্দিন বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন।

মেজর জিয়া ছাড়া অপর আসামিরা হলেন- মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন (সাংগঠনিক নাম শাহরিয়ার), আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, আকরাম হোসেন ওরফে আবির, মো. মুকুল রানা ওরফে শরিফুল ইসলাম ওরফে হাদী, মো. আরাফাত রহমান, শফিউর রহমান ফারাবি। মেজর জিয়া ও আকরাম হোসেন পলাতক রয়েছেন।

আসামিদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ

আসামি মোজাম্মেল হুসাইন, আকরাম হোসেন, হাসান ও আবু সিদ্দিক হত্যাকাণ্ডের দুই মাস আগে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ১৯২/২ নম্বর বাসাটি ভাড়া নিয়ে অভিজিত রায়কে বিভিন্ন স্থানে অনুসরণসহ হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করেন। আসামি মোজাম্মেল রেকি টিমের নেতৃত্ব প্রদান করাসহ অপারেশন শাখার মকুল রানাকে অনুসরণসহ এর হত্যাকাণ্ডের সার্বিক সহযোগিতা এবং আসামিদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন।

অপরদিকে আসামি আবু বকর, আকরাম ও হাসান ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যার অভিপ্রায় অনুসরণ এবং রেকি করাসহ হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী আসামিদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন।

আসামি আরাফাত রহমান, আলী ওরফে খলিল, অনিক ও অন্তু আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অপারেশন শাখার সদস্য সাংগঠনিকভাবে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে টার্গেট ব্যক্তিকে হত্যা করা। আর অভিজিতকে তারা চারজনই চাপাতি দিয়ে নির্মমভাবে কোপায়।

অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে তাকেও কুপিয়ে বাম হাতের বৃদ্ধা আঙুল কেটে ফেলে এবং মারাত্বক আহত করে।
অপারেশন শাখার চারজন আসামি যাতে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারে তার জন্য তাদের চারপাশে আসামি মেজর জিয়া, সেলিম, মুকুল রানা, মোজাম্মেল, আবু সিদ্দিক, আকরাম ও হাসান অভিজিৎ রায়কে কোপানোর সময় কর্ডন করে রাখে।

যে কারণে অব্যাহতির আবেদন

অব্যাহতি আবেদনের আসামিরা হলেন- সাদেক আলী ওরফে মিঠু, মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান, আমিনুল মল্লিক, জাফরান হাসান, জুলহাস বিশ্বাস, আব্দুর সবুর ওরফে রাজু সাদ, মাইনুল হাসান শামীম, মান্না ইয়াহিয়া ওরফে মান্নান রাহি, আবুল বাশার, মকুল রানা, সেলিম, হাসান, আলী ওরফে খলিল, অনিক ও অন্তু।

আসামি সাদেক আলী ওরফে মিঠু, মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান, আমিনুল মল্লিক, জাফরান হাসান, জুলহাস বিশ্বাস, আব্দুর সবুর ওরফে রাজু সাদ ও মাইনুল হাসান শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অব্যাহতি আবেদন করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

মান্না ইয়াহিয়া ওরফে মান্নান রাহি ও আবুল বাশার চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যায়। মকুল রানা খিলগাঁও এলাকায় বন্ধুকযুদ্ধে মারা যায়। অপর পাঁচ আসামি সেলিম, হাসান, আলী ওরফে খলিল, অনিক ও অন্তের নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতি আবেদন করেন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

অভিজিৎ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী মেজর জিয়া

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ওই তিনজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ ও তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণাদি সবকিছু মিলে স্পষ্ট হয়েছে এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী- সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত পলাতক মেজর জিয়া।

যে কারণে টার্গেটে পড়েন অভিজিৎ

অভিজিতের লেখালেখি ও ভিন্নমতের জন্য তাকে অনেক আগেই টার্গেট করা হয়। তার ‘বিশ্বাসে ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ নামক দুটি বইকে কেন্দ্র করে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় আনসার আল ইসলাম। তাদের ডিসিশন মেকিং একটা বডি আছে। তারাই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সম্ভাব্য টার্গেটের তালিকা করে। এরপর মেজর জিয়া ও স্পেচুয়াল লিডারের অনুমোদন দেয় কাকে হত্যা করা যাবে আর যাবে না। তাদের দুটি গ্রুপ কাজ করে। একটি রেকি বা ইনটেলিজেন্স গ্রুপ আরেকটি কিলিং গ্রুপ।

অভিজিৎ রায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন। তাই তিনি কবে দেশে আসবেন তা তালাশ করেন। অভিজিতের বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে গোপনে খোঁজ করতে থাকেন কবে দেশে ফিরবেন তিনি। তারা প্রকাশনী ও পরিবার সূত্রে জানতে পারে যে, অভিজিৎ বইমেলার সময় অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ফিরতে পারেন।

সে লক্ষ্যেই তারা রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে তাদের কথিত মারকাজ বা বাড়ি ভাড়া নিয়ে অবজার্ভ করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা নিশ্চিত হয় অভিজিৎ রায় দেশে ফিরেছে। এরপর থেকে তারা নিয়মিত বইমেলায় যাতায়াত করতে থাকে। ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা অভিজিৎকে রেকি করতে থাকে। ২২ ফেব্রুয়ারি তারা জাগৃতি প্রকাশনীর সামনে তারা অভিজিৎকে দেখতে পায়।

ওইদিন স্ত্রীকে নিয়ে অভিজিৎ রায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যায় বার-বি-কিউ পার্টিতে। যে কারণে তাদের মিশন সেদিন সাকসেস হয়নি। এরপর ২৩, ২৪ ও ২৫ তারিখেও তারা ফলো করেছে। ২৬ তারিখে তারা হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সে লক্ষ্যে তারা বইমেলায় গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজেও সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ফারাবি সরাসরি জড়িত না হলেও প্ররোচণা দিয়েছিল

র্যাবের হাতে গ্রেফতার ফারাবি সরাসরি অভিজিৎ হত্যায় জড়িত ছিল না। তবে তিনি অভিজিতের ফেসবুকে বলেছিল, একে (অভিজিৎ) কেউ কোপায় না কেন? দেশে আসলে একে কুপিয়ে কুপিয়ে খণ্ড খণ্ড করতে হবে। তবে যে গ্রুপটি অভিজিৎকে হত্যা করেছে তাদের সঙ্গে ফারাবির সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। তবে তার প্ররোচণামূলক ফেসবুক পোস্ট কিলারদের প্ররোচিত করেছে বলে তাকে ক্যাটালিস্ট হিসেবে দেখা হয়েছে।

পেনাল কোডে মামলা, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চার্জশিট

অভিজিৎ হত্যা মামলা রুজু হয়েছিল সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। তবে যেহেতু ঘটনাটি আনসার আল ইসলাম নামে একটি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনের কাজ সে জন্য আমরা সেটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চার্জশিট দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়কে ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে জখম করে। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরে ২৭ ফেব্রুয়ারি অভিজিতের বাবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অজয় রায় শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

সূত্রঃ জাগোনিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here