এসো হে বৈশাখ … অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

    0
    4

    অনলাইন ডেস্কঃ
    নতুন এক সূর্য উঠেছে প্রতিদিনের মতো। কিন্তু এ সূর্যোদয়ের সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছে নতুন এক বছর। নব স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে আর পুরনোকে স্মৃতির মণিকোটরে গেঁথে এসেছে নতুন এ বছর। নতুন বছর উদযাপনে প্রস্তুত এখন দেশবাসী। কিন্তু তার মাঝে বেদনার করুণ সুর বাজছে। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের মৃত্যু কাঁদাচ্ছে এখনও। নতুন বছরের প্রাক্কালে গতকাল মানববন্ধন করে তার হত্যাকারীদের বিচার চেয়েছে মানুষ। নুসরাতকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে, নব আলোর শিখায় প্রজ্বলিত হওয়ার শপথ নেবে আজ বাঙালি। সব জীর্ণতা, সব অমঙ্গলকে অগ্নিস্নানে পুণ্য করার প্রত্যয়ের দিন আজ।

    আজ রোববার, পহেলা বৈশাখ। বাংলা সনের প্রথম দিবস।

    স্বাগত ১৪২৬।
    শুভ নববর্ষ।

    বৈশাখ বরণ করে আজ সবাই যেমন বলবে-
    ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।’ তেমনি কায়মনে প্রার্থনা করবে- ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’

    উৎসবে অবশ্য আজ খানিকটা হলেও ভাটা পড়েছে নানা কারণে। একদিকে নুসরাতের মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে মৌলবাদী জঙ্গি অপশক্তির অপতৎপরতাকে বিবেচনায় নিয়ে ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে’ গত তিনবারের মতো এবারও বিকেল ৫টার মধ্যে বর্ষবরণের সব অনুষ্ঠান শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই মাঝে দেশের আপামর জনগণের প্রত্যাশা- নতুন বছরে সব অমঙ্গলকে দূর করে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে পূর্ণ শান্তির দ্যুতি।

    ইতিহাসবিদদের মতে, বৈদিক যুগে বাংলা সনের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। মোগল সম্রাট আকবর ফসলি সন হিসাবের সুবিধার্থে বৈশাখ মাসকে প্রথম মাস ধরে বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু করেন। নবাব মুর্শিদকুলি খান বৈশাখ মাস থেকে বাংলায় প্রথম খাজনা আদায় শুরু করেন। জমিদারি আমলে বৈশাখের মূল আয়োজন ছিল খাজনা আদায় উপলক্ষে ‘রাজপুণ্যাহ’ ও ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ উৎসব। জমিদারি প্রথা বিলোপের পর রাজপুণ্যাহও বিলুপ্ত হয়। আর আধুনিক সময়ে অর্থনৈতিক লেনদেনের ধারায় পরিবর্তন আসায় হালখাতাও তার জৌলুস হারিয়েছে। বর্তমানে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে তাই মুখ্য হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, যা প্রবর্তনের কৃতিত্ব পুরোটুকুই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনি শান্তিনিকেতনে প্রথম ঋতুভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করেন। বর্তমানে এ উৎসবকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এসেছে নতুন এক গতিশীলতা।

    বর্ষবরণ উপলক্ষে আজ পহেলা বৈশাখ রোববারে রয়েছে সরকারি ছুটি। তবে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজ মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চলবে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সংবাদপত্রগুলোও প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। রেডিও-টেলিভিশনে প্রচার হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

    কর্মসূচি:
    সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব্ব ব্যবস্থাপনায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোও বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করছে। সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শিশু পরিবারের শিশু ও কারাবন্দিরা সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করবে। থাকছে কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা। জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় জাদুঘর ও প্রত্নস্থানগুলোও সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।

    এবারও পহেলা বৈশাখের মূল আয়োজন চলছে রমনা উদ্যানের অশ্বত্থমূলে, যা পরিচিত ‘রমনার বটমূল’ নামে। ছায়ানটের এ আয়োজনের এবারের প্রতিপাদ্য- ‘অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’। এ বিষয়ে কথা বলবেন ছায়ানট সভাপতি ড. সন্‌জীদা খাতুন। সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বেরোবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এর এবারের প্রতিপাদ্য- ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’। যার মধ্য দিয়ে অস্থির সময়ে প্রেরণার ডাক দেবেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রয়েছে চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে ‘হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ’। ভোর সাড়ে ৫টায় শুরু হওয়া এ আয়োজন চলবে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে শিশুপার্কের পাশে নারকেলবীথি চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান ‘জাগো নব আনন্দে’। অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা ও সঙ্গীতশিল্পী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনকে। সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হবে এ অনুষ্ঠান। গানে গানে নতুন বছরকে বরণের এ আয়োজনে সংবর্ধনা প্রদান করা হবে কণ্ঠশিল্পী তপন চৌধুরী এবং বাচিক শিল্পী ইকবাল খোরশেদ ও ঝর্ণা সরকারকে।

    একটি উত্তর ত্যাগ

    Please enter your comment!
    Please enter your name here