সিরাজের শাস্তি চায় স্বজনরাও

0
4

অনলাইন ডেস্কঃ
ফেনীর সোনাগাজীতে এমন নৃশংস বর্বরতা আগে কেউ দেখেননি। এ নির্মমতা ও লজ্জার এ গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছেন এখানকার সাধারণ মানুষ। মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির করুণ আর্তনাদ এখনও ভুলতে পারছেন না তার বন্ধু ও সহপাঠীরা। তার মা শিরিন আক্তার ঘুমের মাঝে এখনও চিৎকার করে ওঠেন। বিধাতার কাছে কিছুক্ষণ পর পর দু’হাত তুলে দুঃখ সইবার শক্তি প্রার্থনা করেন।

এদিকে, নুসরাত হত্যার বিচার চেয়ে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। প্রতিবাদী ধিক্কার ছড়িয়ে পড়েছে নুসরাত হত্যার প্রধান আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার গ্রামের বাড়িতেও। তার স্বজনরাও নুসরাত হত্যার কঠিন শাস্তি চান।

গতকাল শনিবার দুপুরে সোনাগাজীর ৮নং আমিরাবাদ ইউনিয়নের চর কৃষ্ণজয় গ্রামে অধ্যক্ষ সিরাজের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার ঘরে তালা। বাড়ির সামনে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। সোনাগাজী মডেল থানার এসআই কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে চার পুলিশ সদস্য সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সিরাজের বাড়ির অন্যান্য ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তার আত্মীয়রা। সিরাজের বড় ভাইয়ের স্ত্রী হাছিনা আক্তার বলেন, সিরাজ-উদ-দৌলার বাড়িতে একটি ঘর থাকলেও এখানে কেউ থাকেন না। তিনি বাড়িতে খুব কম আসেন। পরিবার নিয়ে থাকেন ফেনীর পাঠানবাড়িতে। তিনি বলেন, মেয়েটার জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছি। আমার দেবর যদি এ ঘটনায় দোষী হন তাহলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। সিরাজ-উদ-দৌলার গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. গোলাম কিবরিয়া শামীম বলেন, আমাদের গ্রামটি খুব শান্তিপূর্ণ। একটি ঘটনায় পুরো গ্রাম কলঙ্কিত হয়ে গেছে। আমরা নুসরাত হত্যার কঠিন শাস্তি দাবি করছি।

নুসরাত হত্যায় জড়িত থাকার সন্দেহে আটক অধ্যক্ষ সিরাজের শ্যালিকার মেয়ে মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী উম্মে সুলতানা পপির মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার বাবা সহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, অধ্যক্ষ আমার ভায়রা। তিনি যে অপকর্ম করেছেন এতে তাকে আত্মীয় পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করি। তার অপকর্মের বলি হয়েছে আমার মেয়ে। আমার মেয়ে শুধু তার আত্মীয় হওয়ার কারণে ফেঁসে গেছে। তার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে সিরাজের কারণে।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার দাবি: গতকাল দুপুরের পর সোনাগাজীর চর চান্দিয়া গ্রামে নুসরাতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়ি শোকে স্তব্ধ। এখনও ঘর থেকে থেমে থেমে কান্নার আওয়াজ আসছে। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার মেয়ের শোকে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। ঘরের সামনে কথা হয় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সঙ্গে। তিনি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার বিচার দাবি করেন। নোমান বলেন, কোনো আসামি যেন ছাড়া না পায়। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান তিনি। একই সঙ্গে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করায় পিবিআইয়ের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান। এ সময় তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, যতদিন পুলিশ পাহারা আছে ততদিন হয়তো নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা নেই। পুলিশ চলে গেলে আমরা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ব। এ বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নুসরাতের ভাই বলেন, আমার বোনের মৃত্যুর পর বাড়ি থেকে বের হতে পারি না। আমাদের মাঝে অজানা এক আতঙ্ক ভর করেছে। ঘর থেকে বের হতেই ভয় পাচ্ছি। মনে হচ্ছে খুনিদের সহযোগীরা আমাদের অনুসরণ করছে।

পরীক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্নিত: অধ্যক্ষ সিরাজের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রাণ হারানো সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। সেই মাদ্রাসায় গত ৬ এপ্রিল পরীক্ষা চলাকালীন আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় তাকে। নুসরাতের মৃত্যুর পর মাদ্রাসায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন জোরদার করা হয়েছে, আবার একের এক বিভিন্ন তদন্ত দল, সাংবাদিক, সংগঠন, রাজনীতিবিদসহ সরকারের নানা দপ্তরের প্রতিনিধি দল মাদ্রাসায় আসছে। প্রতিনিধি দলগুলো যখন আসে প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে মাদ্রাসায় ডেকে আনা হচ্ছে। এতে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা বিঘ্নিত হচ্ছে। নুসরাতের সহপাঠী নাসরিন সুলতানা বলেন, ঘটনার পর থেকে আমরা এমনিতেই পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছি না, তার ওপর বাড়ি থেকে মাদ্রাসায় বার বার ডেকে নিয়ে প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়।

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা থেকে এবার ৩৮৬ জন শিক্ষার্থী আলিম পরীক্ষা দিচ্ছেন। মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. হোছাইন বলেন, আমরা আমাদের মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী করার চেষ্টা করছি। নুসরাত হত্যার পর মাদ্রাসার ওপর একের পর এক ধকল যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের তা থেকে বাইরে রাখার চেষ্টা করছি।

সূত্রঃ সমকাল

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here