বৈশাখী পূর্ণিমাকে ঘিরে কক্সবাজারের ১২৯টি বৌদ্ধ বিহারে নিরাপত্তা জোরদার

0
6

সুনীল বড়ুয়াঃ
কক্সবাজার: বৌদ্ধদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা উদযাপন করা হচ্ছে কাল শনিবার। সারাদেশের বৌদ্ধদের পাশাপাশি বাংলাদেশী বৌদ্ধরাও ধর্মীয় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মহামতি বুদ্ধের জন্ম,মৃত্য ও মহাপরিনির্বাণ লাভের ত্রিস্মৃতি বিজড়িতি এ দিনটি পালন হবে । রামুর ২৭টিসহ জেলার ১৪৭টি বৌদ্ধ বিহারে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

তবে বুদ্ধপূর্ণিমা ঘিরে বাংলাদেশের বৌদ্ধ বিহার ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে আত্মঘাতী জঙ্গী হামলা চালানোর হুমকির বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসার পর থেকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাঝে একটু ভয়-ভীতির সঞ্চার হয়েছে।

তবে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই জানিয়ে পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন জানান জঙ্গী হামলাসহ যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে রামুর ২৭টিসহ ১২৯টি বৌদ্ধ বিহারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। জেলার প্রায় ১৪৫টি বৌদ্ধ বিহারে ৬৫০জন পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া থাকবে প্রতিটি বিহার ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল। প্রতিটি বিহারের সাথেই যেকোনো প্রয়োজনে সার্বক্ষনিক যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন,বৈশাখী পূর্ণিমার অনুষ্ঠানে জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটা নিয়ে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে জেলার বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। প্রতিটি বিহারে পুলিশ, আনসার, কমিউনিটি পুলিশ ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের সমন্বয়ে নিরাপত্তা কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওইদিন বিহার ও অনুষ্ঠানস্থলে তিন স্তরের নিরাপত্তার বলয় গড়ে তোলা হবে।

‘শুক্রবার থেকে আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা বিহারে বিহারে কাজ শুরু করেছে। পুলিশের পাশাপাশি আনসার,র‌র‌্যাব এবং সাদা পোষাকেও অাইন শৃংখল বাহিনীর লোকজন দায়িত্ব পালন করবে’। যোগ করেন মাসুদ।

তিনি বলেন, ২০১২ সালের রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বসতি হামলার ঘটনার পর থেকে সেখানকার বৌদ্ধ বিহারগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়। তাই রামুর ২৭টি বৌদ্ধ বিহারে আরো বেশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং নজরদাড়ি বাড়ানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, বুদ্ধপূর্ণিমাকে ঘিরে সম্প্রতি ইসলামিক স্টেট (আইএস), জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের বৌদ্ধ বিহার ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে আত্মঘাতী হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে- এমন তথ্য জানিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (আইবি) বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক বার্তা দেয়। এরপর পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরাপত্তামূলক এ ব্যবস্থা গ্রহন করে।

এদিকে মহামতি বুদ্ধের ত্রি স্মৃতি বিজড়িত এদিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে বৌদ্ধ বিহারগুলোতে বুদ্ধপূজা, জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, অষ্টশীল ও পঞ্চশীল গ্রহণ, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কারদান, হাসপাতালে রোগীদের খাদ্যদান, শান্তি শোভাযাত্রা, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, আলোকসজ্জ্বা, ধর্ম দেশনা শ্রবণ, দেশ এবং বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন রাখা করা হয়েছে। বিশেষ করে বৌদ্ধ পুরাকীর্তির শহর খ্যাত সম্রাট অশোক নির্মিত রামুর রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার,রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহার,রামু মৈত্রী বিহারসহ উপজেলার ২৭টি বৌদ্ধ বিহারে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়েছে।

বাংলাদেশী বৌদ্ধদের অতি পবিত্র তীর্থস্থান রামু রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ জ্যোতিসেন থের জানান, শুক্রবার (১৭ মে) বিকাল ৪টায় ১০১জনকে শ্রামন ও ১০জনকে ভিক্ষু হিসাবে প্রবজ্জ্যাদানের মধ্যদিয়ে এ বিহারে বৈশাখী পূর্ণিমার অনুষ্ঠান শুরু হবে। এরপর সন্ধ্যে ৭ টায় শুরু হবে বুদ্ধ কীর্তণ, রাত ১২টা ১মিনিটে পূজা সাজানো এবং শনিবার ভোর ০৪টা ০১ মিনিট থেকে বুদ্ধ পূজা উত্তোলন শুরু করা হবে। তিনি বলেন,বাংলাদেশী বৌদ্ধদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থস্থান এই রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার। তাই প্রতি বছর এই দিনে হাজার হাজার পূর্ণ্যার্থীর সমাগম হয় এখানে। তাই আইন শৃংখলাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ বিহারে কয়েকস্থরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, বুদ্ধপূর্ণিমার দিনে জঙ্গী হামলার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটু ভয়-ভীতি কাজ করছে। তবু আইন শৃংখলাবাহিনীর পক্ষ থেকে যেভাবে নিরাপত্তা বলয় বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, আমরা আশা করছি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ পরিবেশে শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা উদযাপিত হবে। তবুও অমরা অনেক সতর্কতার সাথে কাজ করছি। প্রতিটি বিহারের নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রশাসনও বেশ তৎপর রয়েছে। তিনি বলেন, হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী কক্সবাজার সদরে-১৪টি, রামুতে ২৭টি, উখিয়ায় ৪১টি,টেকনাফে ১৭টি, চকরিয়ায় ২১টি,পেকুয়ায় ১টি,মহেশখালীতে ৮টিসহ মোট ১২৯টি বৌদ্ধ বিহার রয়েছে। প্রতিটি বিহারেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ২০১২ সালের রামুর বৌদ্ধ বিহারে হামলা এর পরে যোগ হয় রোহিঙ্গা সমস্যা। বরতমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে উখিয়া টেকনাফে। তাই নানা কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কক্সবাজারের এখন ব্যাপক পরিচিত। তাই এবারের বুদ্ধপূর্ণিমায় যে জঙ্গী হামলার আশংকা করা হচ্ছে, তা মোকাবেলায় পুলিশসহ অাইন শৃংখলা বাহিনী বিশেষভাবে কাজ করছে। আশা করছি, শান্তিপূর্ণভাবে আমরা এ উৎসব উদযাপন করতে পারবো। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ৩০ থেকে ৪০টি বিহার সিসিটিবি ক্যামেরার আওতায় থাকবে।

উল্লেখ্য, খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে জন্ম হয় মানবপুত্র সিদ্ধার্থের। সেদিন ছিল শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। ঊনত্রিশ বছর বয়সে তিনি সংসার ত্যাগ করে গভীর সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। অবশেষে দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর সাধনার পর পয়ত্রিশ বছর বয়সে তিনি সম্যক বুদ্ধত্ব ফল লাভ করেন। সেদিনও ছিল শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা। এরপর পয়তাল্লিশ বছর ধর্মপ্রচার করে পঁচাশি বছর বয়সে তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। সেই দিনটাও ছিল শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা। একই দিনে জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ লাভের ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় বৈশাখী পূর্ণিমার অপর নাম বুদ্ধপূর্ণিমা।

গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের পর থেকে বুদ্ধবর্ষ গণনাকাল শুরু হয়। গৌতম বুদ্ধ খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৪ অব্দে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। সেই হিসাবে আজ (৫৪৪+২০১৯) বুদ্ধের পরিনির্বাণের ২৫৬৩ বছর পূর্ণ হল। আর জগতে গৌতম বুদ্ধের আর্বিভাব হয় আজ থেকে (২৫৬৩+৮০) ২৬৪৩ বছর পূর্বে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here