ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে প্রতি রমজানে হয় ইফতার বিতরণ

0
3

বোরহান বিশ্বাসঃ
রাজধানীর সবুজবাগ থানার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার। তারই প্রার্থনা হলের সামনে টুকরিতে করে নিয়ে আসা হচ্ছে প্যাকেটজাত ইফতার। ইফতারের প্যাকেটগুলো টেবিলে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। দরিদ্র-অসহায়দের মাঝে এগুলো বিতরণ করা হবে।

কিছু বৌদ্ধ তরুণ এ নিয়ে শশব্যস্ত। কাজের ফাঁকে কথা হলো বিতরণের দায়িত্বে থাকা ভিক্ষু নিভ্যুতিনন্দ মহাথেরোর সঙ্গে।

তিনি বলেন, “প্রতি বছরই বৌদ্ধ মহাবিহারের পক্ষ থেকে ইফতার বিতরণের এ আয়োজনটি করা হয়ে থাকে। প্রথম রমজান থেকে শেষ রমজান পর্যন্ত তা চলে।”

এমন একটি মহৎ কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতে পেরে খুবই আনন্দিত জানিয়ে ভিক্ষু নিভ্যুতিনন্দ বলেন, “নিজের হাতে দুস্থ-রোজাদারদের ইফতার তুলে দিচ্ছি। এটা খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার। ওইসব মানুষ আমাদেরকে অনেক ভালোবাসেন। আমরাও তাদেরকে ইফতার দিতে পেরে খুশি।”

মহাবিহারের অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি ভিক্ষু শুদ্ধানন্দ মহাথের নিজ হাতে অনেক বছর ধরে ইফতার বিতরণ করে আসছেন। শারীরিক অসুস্থতায় এবার তিনি সরাসরি এ কাজের দেখভাল করতে পারছেন না। তবে তার পরামর্শেই এই আয়োজন বলে জানিয়েছে ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার।

ইফতার নিতে আসা মানুষের জন্য বিহারের ভেতরে কিছুটা বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এতে পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতা নেওয়া হয়।

নারী-পুরুষ সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরর অনুমতি সাপেক্ষে ইফতার দেওয়া শুরু হয়। মুড়ি, বুট, জিলাপি, আলুর চপ, পিয়াজু, বেগুনি মিলিয়ে একেকটি প্যাকেট সবার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ইফতার নিতে যারা এসেছেন তাদের অধিকাংশই নারী।

বোরহান বিশ্বাস

তাদেরই একজন সমিরন খাতুন বলেন, “প্রতি বছর রোজায় এখান থেকে ইফতার নিয়ে যান। ইফতারে জন্য তাকে কোনো চিন্তা করতে হয় না।”

লতিফা বেগম জোগালির কাজ করেন।

তিনি বলেন, “সারাদিন কাজ করার পর ইফতার বানাতে মন চায় না। বাসাও অনেক দূরে। তাই এখান থেকে প্যাকেট নিয়ে ইফতার সারি।”

এখানে একজন কেতাদুরস্ত ব্যক্তিকেও ইফতার নিতে দেখা যায়।

তিনি বলেন, বিহারের পাশের একটি জুতোর দোকান তার। ৪০ বছর ধরে এই এলাকায় আছেন। সময় ও শ্রম বাঁচাতে প্রতিদিন এখান থেকে ইফতারের প্যাকেট নিয়ে যান।

সম্প্রীতির কথা উল্লেখ করে বললেন, “কখনোই মনে হয় না অন্য ধর্মের কারো কাছ থেকে ইফতার নিচ্ছি। তারা তো গরীব মানুষের উপকারের জন্যই এই মহান কাজটি করছেন।”

প্রায় প্রতিটি মসজিদেই রোজাদারদের জন্য ইফতারের বিশেষ ব্যবস্থা থাকে। এছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধনবান ব্যক্তিদের রমজানে ইফতার বিতরণ তেমন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় থেকে মুসলিমদের জন্য ইফতার বিতরণ সাধারণত চোখে পড়ে না। কেন এই উদ্যোগ তা নিয়ে জানা গেল ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার থেকে।

সিঙ্গাপুরের নাগরিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ী মি. ভিক্টর লি ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো উদ্যোগী হয়ে এ ইফতারের আয়োজন করেন। এরপর বিহারের পক্ষ থেকেই ইফতার বিতরণের আয়োজন করা হয়।

এছাড়া বৌদ্ধ বিহারের একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু ও তার কয়েকজন বন্ধু মিলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে পরামর্শ নিয়ে কাজটি ভালোভাবে শুরু করেন।

“ধর্ম নয়, মানবতাই তাদের মানুষে-মানুষে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি স্থাপনের তাগিদ দেয়”, এমন চিন্তাতেই বিশ্বাস রাখেন তারা।

এই আয়োজন দেখে আমার উপলব্ধি হলো, বিশ্বব্যাপী যেখানে জঙ্গিবাদের বিষাক্ত ফণা মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে তার বিপরীতে এমন সম্প্রীতির সেই বন্ধন উপস্থাপন করে এখানকার মানুষ একটি উদাহরণ গড়ে দেখালো।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here